অপসংগতি মূলক আচরণ : বিদ্যালয় পলায়ন (School Truancy)
১. ভূমিকা
শৈশব, বাল্যকাল ও কৈশোরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেগুলোকে অপসংগতি মূলক আচরণ বলা হয়। এসব আচরণের মধ্যে বিদ্যালয় পলায়ন বা স্কুল পালানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এটি শুধু শিক্ষাজীবনেই নয়, ভবিষ্যতের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই আচরণের প্রকৃতি, কারণ, প্রভাব এবং প্রতিকার সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
২. বিদ্যালয় পলায়ন (School Truancy)
"Truancy" শব্দটির অর্থ হলো যথাযথ কারণ বা অনুমতি ছাড়াই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকা অথবা বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে অনুমতি ছাড়া বিদ্যালয় ত্যাগ করা। কোনো শিক্ষার্থী যদি নিয়মিতভাবে শিক্ষক বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে কিংবা বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যায়, তবে সেই আচরণকে বিদ্যালয় পলায়ন বলা হয়।
একদিনের অনুপস্থিতি সবসময় বিদ্যালয় পলায়ন হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে যখন এটি বারবার বা দীর্ঘ সময় ধরে ঘটে, তখন তা একটি অপসংগতি মূলক আচরণে পরিণত হয়। অনেক সময় শিক্ষাগত সমস্যা, পারিবারিক অসুবিধা, দারিদ্র্য বা মানসিক চাপও এই আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এটি ভবিষ্যতে আরও গুরুতর আচরণগত সমস্যার সূচনা করতে পারে।
প্রকারভেদ
শিক্ষার্থীদের আচরণের ভিত্তিতে বিদ্যালয় পলায়নকে সাধারণত চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়।
১. আকস্মিক পলায়ন :এই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী হঠাৎ কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই মাঝে মাঝে বিদ্যালয় থেকে অনুমতি ছাড়া চলে যায়।
২. অভ্যাসগত পলায়ন :কিছু শিক্ষার্থী নিয়মিত অভ্যাসবশত বিদ্যালয়ে না এসে বা মাঝপথে বিদ্যালয় ত্যাগ করে। এটি ধীরে ধীরে তাদের স্বভাবের অংশ হয়ে ওঠে।
৩. ভীতি-প্রসূত পলায়ন :শিক্ষক-শিক্ষিকার ভয়, শাস্তির আশঙ্কা, পড়া না পারা বা পরীক্ষাভীতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করে অথবা বিদ্যালয় থেকে পালিয়ে যায়।
৪. দীর্ঘস্থায়ী পলায়ন :যখন কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে বা বারবার বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে, তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যালয় পলায়ন বলা হয়।
৩. বিদ্যালয় পলায়নের কারণ
বিদ্যালয় পলায়নের পেছনে বিভিন্ন ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও বিদ্যালয়ভিত্তিক কারণ কাজ করে। প্রধান কারণগুলো হলো—
- পাঠ্যক্রম শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও সক্ষমতার উপযোগী না হওয়া।
- শারীরিক অসুস্থতা বা দুর্বল স্বাস্থ্য।
- মানসিক অস্থিরতা বা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা।
- আত্মবিশ্বাস ও আত্মসচেতনতার অভাব।
- শিক্ষক-শিক্ষিকার কঠোর বা বিরূপ আচরণ।
- শিক্ষক বা বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ভয় বা উদ্বেগ।
- অসৎ বা নেতিবাচক সঙ্গের প্রভাব।
- শিক্ষার্থীর চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া।
- সহপাঠীদের সঙ্গে অভিযোজনে সমস্যা।
- বিদ্যালয়ের অস্বাস্থ্যকর বা অনাকর্ষণীয় পরিবেশ।
- ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাদান পদ্ধতি।
- বিদ্যালয়ের নিয়মকানুনের প্রতি অসন্তোষ।
- অল্প বয়সে প্রেম বা আবেগজনিত বিভ্রান্তি।
৪. শিক্ষার্থীর উপর বিদ্যালয় পলায়নের প্রভাব
বিদ্যালয় পলায়নের ফলে শিক্ষার্থীর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেমন—
- পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া এবং শিক্ষার মান হ্রাস পাওয়া।
- বিদ্যালয় ত্যাগের ঝুঁকি বৃদ্ধি।
- সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়া।
- অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি।
- আইন ও সামাজিক নিয়মের প্রতি অনীহা সৃষ্টি।
- ভবিষ্যতে বেকারত্বের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া।
- মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি।
- বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়া।
- মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতি আসক্তি বৃদ্ধি।
- ভয়, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়া।
- আক্রমণাত্মক বা সহিংস আচরণ বৃদ্ধি পাওয়া।
৫. বিদ্যালয় পলায়ন প্রতিরোধে বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা
ক) বিদ্যালয় ও শিক্ষক-শিক্ষিকার ভূমিকা
- শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও আকর্ষণীয় পাঠদান নিশ্চিত করা।
- বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা।
- পুষ্টিকর খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা।
- শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।
- তাদের চাহিদা ও সমস্যার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া।
- শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আদর্শ ও সহানুভূতিশীল আচরণ প্রদর্শন করা।
- সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের সুযোগ বৃদ্ধি করা।
- প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কাউন্সেলিং সেবা চালু করা।
- সৎসঙ্গ ও ইতিবাচক বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে উৎসাহ দেওয়া।
- স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলা বজায় রাখতে উৎসাহিত করা।
- প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করা।
- শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সময় ব্যয় করা।
- শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে আন্তরিক ও বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
খ) পিতামাতার ভূমিকা
- সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখা।
- সহানুভূতিশীল ও ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি করা।
- সন্তানের পড়াশোনা ও বিদ্যালয় জীবনের প্রতি নিয়মিত নজর রাখা।
- মানসিক অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা।
- সন্তান প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা।
- প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের পরামর্শ গ্রহণ করা।
৬. উপসংহার
বিদ্যালয় পলায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ অপসংগতি মূলক আচরণ, যা প্রাথমিক পর্যায়েই চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। গবেষণায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের কিশোর অপরাধের সঙ্গে বিদ্যালয় পলায়নের সম্পর্ক রয়েছে। তাই শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা দেখা দিলে তার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

